রিভিউ (মুভি) : “ছুঁয়ে দিলে মন”

হৃদয়পুরের ছেলে আবির। এলাকার বড় ভাইয়ের প্রেমে সাহায্য
করতে গিয়ে টিনেজ আবিরের পরিচয় হয় নিলার সাথে। সেই
বয়সেই দুজনের মধ্যে ভাল লাগা তৈরি হয় কিন্তু এরপরই ঘটে যায় কিছু
বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আবির-নীলা হয়ে যায় আলাদা। দুজন দুজনের কাছ
থেকে অনেক দূরে। বারো বছর পর একদিন হরতাল-অবরোধের
বদৌলতে দুজনের দেখা হয়ে যায় (দাগ থেকে যদি হয় দারুণ কিছু,
তাহলে দাগই ভাল)। কিন্তু এই বারো বছরে পাল্টে গেছে অনেক
কিছু। এই পাল্টে যাওয়া ব্যাপারগুলো নিজেদের আয়ত্বে আনতে
যুদ্ধে নামে আবির, আর সেই যুদ্ধে লুকিয়ে লুকিয়ে সাহায্য করে
অদ্ভুত সিদ্ধান্তহীনতায় ভূগতে থাকা নিলা। মূলত এখন থেকেই শুরু হয়
“ছুঁয়ে দিলে মন” সিনেমার গল্প। কাহিনীতে ঢুকে পড়ে অনেক
ছোট ছোট চরিত্র, তৈরি হয় নতুন নতুন বাঁধা বিপত্তির। সকল সমস্যার
সমাধান করতে এগিয়ে যেতে থাকে আবির-নিলা আর ছবির ডিরেক্টর
শিহাব শাহীন নিজে। উনি দর্শকদের কাছে এমনিতেই অনেক
জনপ্রিয় চমৎকার কিছু টেলিফিল্ম নির্মানের জন্য। ছোট পর্দায় যে
সকল সফল নির্মাতারা সিনেমা বানানো শুরু করেছেন তাদের অধিকাংশই
কেন জানি সিনেমাটা ঠিকভাবে তৈরি করতে পারছেন না, কোথায় যেন
ঘাটতি থেকেই যায়। সুনিপন কাজের জন্য ছোট পর্দায় পাওয়া সাফল্যটা
সিনেমায় ধরে রাখতে পারেন না অনেকেই। সেক্ষেত্রে শিহাব
শাহীন অনেকটাই সফল। পুরোপুরি বানিজ্যিক ধারার খুবই এন্টারটেইনিং
আর কালারফুল একটা সিনেমা উপহার দিয়েছেন দর্শকদের।
ছবিতে নিলা চরিত্রে অভিনয় করেছেন জাকিয়া বারী মম। নিলা চরিত্রে
নিজের শতভাগ দিয়ে আরো বাড়তি কিছু দেয়ার চেষ্টা করেছেন
মম। নিজের সাধারন ঘরোয়া মেয়ের ইমেজটাকে ভেঙ্গে নতুন
রূপে আবির্ভুত হয়েছেন ছুঁয়ে দিলে মনে। মম নিজের অভিনয়
দিয়েই সব সময় নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যান, কিন্তু চমৎকার
অভিনেত্রী মম যে এতটা গ্ল্যামারাস সেটা এই ছবিতেই প্রথম
চোখে পড়লো। ছবিটা রিলিজের আগে এটার কয়েকটা গান
দেখে মম’র মেকাপ নিয়ে বিরক্ত ছিলাম, মাত্রাতিরিক্ত মেকাপ
নিয়েছে মনে হচ্ছিল। কিন্তু বড় পর্দায় মমকে দেখে তেমন
কিছুই মনে হয়নি, বরং মম’র ড্রেস, গেটাপ আর প্রেজেন্টেশন
দেখে রীতিমত মুগ্ধ হয়েছি। এজন্য সিনেমার কস্টিউম
ডিজাইনারকে সাধুবাদ চমৎকার কাজ দেখানোর জন্য। সাধারনত
বর্তমানের বাংলা সিনেমাগুলোতে দেখা যায় অধিকাংশ নায়িকারাই
অভিনয়ে পিছিয়ে থাকে, নিজের সৌন্দর্য দিয়ে সিনেমাটা এগিয়ে
নিয়ে যায়। কয়েক বছর ধরে এমন একটা ট্রেন্ড তৈরি হয়ে
গেছে। কিন্তু মম এটাকে পুরোপুরি ভেঙ্গে নিজের সৌন্দর্যের
সাথে চমৎকার অভিনয় দিয়ে সিনেমাটায় দাপটের সাথে এগিয়ে
গেছেন। দারুচিনি দ্বীপ সহ মম এখন পর্যন্ত ৩-৪টা ছবিতে অভিনয়
করেছেন, কিন্তু এই মুভিতে ছিল মম’র বেস্ট পারফরমেন্স।
নিজেকে একদম ছাপিয়ে গেছেন।
আবির চরিত্রে ছিলেন আরিফিন শুভ। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত
একদম মাপা মাপা অভিনয় করে গেছেন। গত কয়েক বছর ধরে শুভ
অনেকগুলো সিনেমায় অভিনয় করলেও কেন জানি নিজের সেরাটা
ঠিকমত দিতে পারছিলেন না। কখনো ড্যান্স বা অ্যাকশনে এগিয়ে
গেলেও অভিনয়ে ঘাটতি থেকে যেত। কিন্তু এই ছবিতে ফুল
প্যাকেজ নিয়ে আরিফিন শুভ পর্দায় হাজির হয়েছেন। শুভ’র অন্য ছবির
তুলনায় এই ছবিতে তার ড্যান্স আর অ্যাকশনের সুযোগ কম ছিল, তাই
পুরোটা সময় অভিনয়েই বেশি জোর দিতে হয়েছে। এবং
সেক্ষেত্রে আরিফিন শুভ এবার সফল। কোন অতি অভিনয় ছিল না,
পুরোটা সিনেমা জুড়ে একদম মেপে মেপে অভিনয় করে
গেছেন। থাপ্পড় দিতে গিয়ে হাত কতটুকু উপরে উঠে কত টুকুতে
গিয়ে থাকবে সব একদম মাপা মাপা। এক্সপ্রেশন আর ডায়ালোগ
ডেলিভারি পারফেক্ট। এই ছবির জন্য নিজের সূক্ষ সূক্ষ
ব্যাপারগুলোকেও শুভ অনেক আমলে নিয়েছেন সেটা বুঝাই
যাচ্ছিল। পুরো ছবিতে আবির চরিত্রে এক কমপ্লিট শুভকে
পেয়েছে দর্শক।প্রথমবারের মত কোন ছবিতে গুরুত্বপূর্ন চরিত্রে অভিনয়
করেছেন ইরেশ যাকের। এখন পর্যন্ত অনেকগুলো সিনেমায়
ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি এবং সেগুলোতে
পারফরমেন্সও ছিল হতাশা জনক। উনি বরাবরই অনেক ভাল অভিনয়
করেন কিন্তু সিনেমায় আসলে কি যেন এক অদ্ভুত সমস্যা দেখা
দেয়। ডিরেক্টররা উনার কাছ থেকে ইরেশ যাকেরীয়
পারফরমেন্সটা আদায় করে নিতে পারেন না। কিন্তু এই সিনেমায় ছিল
ভিন্ন রূপ। (সবাই এই ছবিতেই কেন নিজের সেরাটা দিল সেটা একটা
ভাববার বিষয়। ডিরেক্টরের কৃতিত্ব!) ব্যাডবয় ড্যানি চরিত্রে এক কথায়
ফাটিয়ে দিয়েছেন ইরেশ যাকের। কখনো হাস্যরস, কখনো
ভয়ংকর চেহারা নিয়ে হাজির হয়েছেন পর্দায়। মূল অভিনেতাদের
সাথে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করে গেছেন। উনার লুক আর চুলের কাট
টা ছিল দূর্দান্ত। অনেক কারনেই ড্যানি চরিত্রের প্রতি একটা বাড়তি
আকর্ষন তৈরি করে ফেলেছিলেন। দর্শককে দেখলাম উনার সব
কিছুই পছন্দ করছে, ভাল খারাপ সব কিছুতেই শিষ বাজিয়ে হাত তালি
দিচ্ছে। এক সময় মনে হলো সাধারন দর্শক কনফিউজ, তারা কার
পক্ষে যাবে নায়কের নাকি ভিলেনের। আমিও সেই দলেরই
একজন সাধারন দর্শক।

Be the first to comment on "রিভিউ (মুভি) : “ছুঁয়ে দিলে মন”"

Leave a Reply