ব্যাবসায়ের পথিকৃৎ যিনি 

ব্যবসা নাম শুনলেই বাঙালির গায়ে জ্বর চলে আসে। তবে বাঙালির না পসন্দ ব্যবসাকে সঙ্গী করেই নাম কামিয়েছিলেন এক বাঙালি। তিনি আলামোহন দাস, হাওড়ার এঁদো গলি থেকেই তাঁর পথ চলা শুরু। তাঁর নামেই গড়ে ওঠে আজকের হাওড়ার অন্যতম জনবহুল এলাকা “দাসনগর”। এখানেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন তাঁর বিশাল সাম্রাজ্য।

https://www.bdnow24.com/category/আজব-দুনিয়া
শুরুর দিনটা মোটেই সহজ ছিল না। ১৩০১ বঙ্গাব্দে হাওড়ার এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হয় আলামোহন দাসের। ২ বছর বয়সে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে ফিরে আসেন মৃত্যুমুখ থেকে। পরিবার পরিজনরা ভেবেছিলেন মরেই গিয়েছে তাদের ছেলে। কিন্তু কথাতেই রয়েছে “রাখে হরি মারে কে!”, ঠিক সেখান থেকেই ফিরে আসেন তিনি। ঠাকুরমা অসুস্থ ছেলের নাম রাখেন “অ্যলা ছেলে”।এই অ্যালা ক্রমে হয়ে যায় “আলা”। আর পিতৃদত্ত নাম মোহনের সঙ্গে জুড়ে হয়ে যায় আলামোহন। এটা ছিল ঝড়ের শুরু।

“অ্যালা” তখন আট বছরের। হঠাৎ করেই মহামারি লেগে যায় তাঁর পরিবারে। পরিবারের নিশ্চিহ্ন হওয়ার জোগাড় হয় রোগের ধাক্কায়। বাবা গোপীকে কোনরকমে বাঁচানো গেলেও খরচ সামলাতে গিয়ে ঘটি বাটি বেচে পথে বসতে হয়। এমত অবস্থায় পরিবারের যাদুর কাঠির রূপ নেয় পৈতৃক বাড়ির ঘরের কোন থেকে পাওয়া এক বস্তা কয়েন। সেই কয়েনই বাঁচিয়ে দেয় অ্যলার পরিবারকে।

“পড়াশোনা করে যে, গাড়ি চাপা পড়ে সে” এই ধারনাতেই বিশ্বাসী ছিলেন আলামোহন দাস। তবে কিছু একটা করবার তাগিদ সব সময়েই ছিল। তাই প্রতিকূলতাকে পাল্টা দেওয়ার শুরু ১১ বছর বয়সে। ওই বয়সেই চলে আসেন কলকাতায়। সেখানে রতিকান্ত দে’র থেকে খই মুড়ি কিনে শুরু করেন নিজের ব্যবসা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলত সেই লড়াই। অল্প দিনেই বেশ ভালো “বেচু বাবু” হয়ে যান আলামোহন। প্রখর ব্যবসা বুদ্ধির জন্য ওই সময়ের মধ্যেই রাস্তা থেকে তাঁর ব্যবসা উঠে আসে কর্ণওয়ালিস স্ট্রিটে নিজের দোকানে। ব্যবসা সামাল দিতে লোক রাখতে হয়।

এর কিছুদিন পরেই নিজের জন্ম শহরে ফিরে আসেন তিনি। ধীরে ধীরে জন্ম হয় হাওড়া কেমিক্যাল ওয়ার্কসের। ১৯৩৭ সালে হাওড়ার শানপুরে প্রতিষ্ঠা করেন ভারত জুট মিল। ওই বছরেই পান “কর্মবীর” পুরস্কার। ১৯৩৮-এ হাজার বিঘা জমির উপর তৈরি করেন ইন্ডিয়া মেশিনারি। সারা ভারতের অন্যতম বড় ব্যবসার কেন্দ্র হয়ে ওঠে এই কোম্পানি। একে একে আলামোহন দাস জন্ম দেন হাওড়া ইনস্যুরেন্স (১৯৪১) , ১৯৪২-এ চিনি কল ও এশিয়া ড্রাগ কোম্পানির। এরপর ১৯৪৬ সালে আলামোহন দাসের হাতে গড়ে ওঠে হাওড়ার “আরতি কটন মিল”। দেশের পাট শিল্পের প্রান কেন্দ্র ছিল আরতি কটন মিল। এখন যা চলে গিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে।

বলা যায় তাঁর হাত ধরেই হাওড়াকে অনেকটা চিনেছিল দেশ। ব্যবসা বিমুখ বাঙালিকে ব্যবসা কিভাবে করতে হয় শিখিয়েছিলেন তিনিই। ১৩৭৩ বঙ্গাব্দে তিনি মারা যাওয়ার পর এই বিশাল সাম্রাজ্য ধরে রাখতে পারেনি পরবর্তী প্রজন্ম। পরে রয়েছে শুধু আলামোহন সাম্রাজ্যের ফসিলটুকু। দাসনগরের মোড়ের মাথায় তাঁর মূর্তিটা এখনও যেন বলছে বাঙালি গা ঝাড়া দিলে এখনও দেখিয়ে দিতে পারে।

Be the first to comment on "ব্যাবসায়ের পথিকৃৎ যিনি "

Leave a comment

Your email address will not be published.


*