বাবা-মা-ছেলের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা! 


 মেয়ে অপেক্ষার সঙ্গে একই ক্লাসে ভর্তি হয়েছিল মা চন্দা। বাড়ি পাঁচ কাজ করেও পরীক্ষায় সমান সমান টক্কর দিয়েছিল মেয়েকে। সেটি ছিল সেলুলয়েডের গল্প। ২০১৬ সালে মুক্তি পাওয়া ছবি ‘নীল বাটে সন্নাটা’র কথাই মনে পড়ে রানাঘাটের আড়ংঘাটা হাজরাপুর উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের তিন পরীক্ষার্থীকে দেখে। সিনেমার চরিত্র অপেক্ষা সহপাঠী হিসেবে পেয়েছিল মা চন্দাকে, আর বাস্তবে বিপ্লবের সহপাঠী তার বাবা-মা দুইজনেই। তিনজনই এ বার উচ্চ মাধ্যমিকে বসছে একসঙ্গে একই স্কুলে।
মঙ্গলবার মামজোয়ান পঞ্চায়েতের পাটিকাবাড়ি গ্রামে গিয়ে দেখা গেল পরীক্ষার আগের দিন কাস্তে হাতে গরু-ছাগলের খাবার জোগাড় করতে গিয়েও পড়ায় ব্যস্ত ৪৩ বছরের বলরাম মণ্ডল। ওদিকে বাড়িতে তখন পোষ্য গরু-ছাগল-মুরগিগুলোকে সামলে আর সংসারের কাজ সারতে সারতে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ৩৩ বছরের কল্যাণী

গোয়াল ঘরে ছুটলেন হাতে বই নিয়েই। চাপে অবশ্য ছিল ছেলে বিপ্লবও। বাবা-মাকে পাস করাতে হবে যে! বাবা-মায়ের প্রাইভেট টিউটর সে নিজেই। আর এখানেই সিনেমা থেকে আলাদা হয়ে যায় মণ্ডল পরিবারের গল্পটা। সহপাঠীদের কাছে চন্দাকে মা বলে পরিচয় দিতে লজ্জা পেত অপেক্ষা। প্রথমদিকে খানিকটা লজ্জা অবশ্য বিপ্লবেরও ছিল। পরে অবশ্য সে নিজেই বাবা-মাকে পড়াশোনায় সাহায্য করতে শুরু করে।
কৃষক বলরাম বললেন, ‘ক্লাস এইট অবধি পড়ে স্কুল ছেড়ে দিয়েছিলাম। বাবা মারা যাওয়ায় রোজগারের পথ দেখতে হয়েছিল। পরে ছেলে যখন পড়াশোনা করছে, তখন ফের পড়ার ইচ্ছে চাউর হলো কল্যাণী ও আমার। রবীন্দ্র মুক্ত বিদ্যালয় থেকে ২০১৪ সালে মাধ্যমিক পাস করি।
পরের বছর কল্যাণীও ওই কেন্দ্র থেকে পাস করে। ছেলের মাধ্যমিকের পর আমাদেরও উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার ইচ্ছে হলো৷ ঠিক করলাম তিনজন একই স্কুলে ভর্তি হব। কিন্তু ছেলে সব স্কুলে ভর্তির সুযোগ পেলেও বয়স্ক বলে আমাদের ভর্তি নিচ্ছিল না বেশির ভাগ স্কুলই। পরে আড়ংঘাটা হাজরাপুর স্কুলে ভর্তির সুযোগ পাই।’
স্কুলের প্রধান শিক্ষক সুদীপকুমার হোতা বলেন, ‘বোর্ডের নিয়ম জানতাম না। আমাদের স্কুলের অবসরপ্রান্ত করণিক বুদ্ধদেব হালদার নিজে মধ্যশিক্ষা পর্ষদের অফিসে গিয়ে খোঁজ-খবর করে নিয়ম জানেন যে, মুক্ত বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করার পর তিন বছরের মধ্যে উচ্চ মাধ্যমিকে রেগুলার কোর্সে ভর্তি হতে কোনো বাধা নেই। এর পরই তিনজনকে একসঙ্গে ভর্তি নিই। ওদের উৎসাহ দেখে আমাদের ভালো লেগেছে। তাই বাড়তি নজর দিয়েছি৷’
ছেলে বিপ্লব বলেন, ‘আমি নিজেই ওদের পড়া দেখিয়ে দিয়েছি। বাবা-মা দুইজনই ইংরেজিতে দুর্বল। তাই পাড়ার চাচা ওদের ইংরেজি দেখিয়ে দিতেন।’
কল্যাণী বলেন, ‘আমরা স্কুল থেকে সবুজ সাথী সাইকেল পেয়েছিলাম। সন্তাহে চারদিন তিন জনে মিলে স্কুলে যেতাম। আর বাকি সময় কখনো ছেলে আর ওর বাবা যেত। কখনো ছেলের সঙ্গে আমি যেতাম।’ নিয়মিত টিটকিরি শুনেছেন৷ কিন্তু তাতে কান দেননি মণ্ডলের পরিবারের সদস্যরা।
বলরাম বলেন, ‘আমি তো ক্লাসের অলিখিত ক্যাপ্টেন ছিলাম। শিক্ষকদের চেয়েও সহপাঠীরা আমাকে মানত বেশি। আমি যেমন বন্ধুর মতো মজা করেছি, তেমনই প্রয়োজনে বাবার মতো শাসনও করেছি সহপাঠীদের। স্কুলে সবাই উৎসাহ দিয়েছেন।’
সিনেমায় অপেক্ষার থেকেও সহপাঠীদের মধ্যে বেশি জনপ্রিয় ছিল তার মা চন্দা। যে কিনা বন্ধুর মতোই মিশে গিয়ে ক্রমশ গাইড করতে শুরু করে নিজের খুদে সহপাঠীদের। স্থানীয় বিধায়ক সমীর পোদ্দার বলেন, ‘যাঁরা বিভিন্ন কারণে পড়া ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, তারা এই পরিবারটিকে দেখে ফের পড়ার অনুপ্রেরণা পাবেন৷ আরো পড়তে চাইলে আমি ওদের পাশে আছি।’
বীরনগর উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের সদ্য অবসরপ্রান্ত প্রধান শিক্ষক দীপঙ্কর দেবনাথ বলেন, ‘জীবনে কেউ যদি পজিটিভ চিন্তাধারা নিয়ে চলে, সে সাফল্য পাবেই। বলরাম-কল্যাণী এর জ্বলন্ত উদাহরণ। খুব ভালো লাগছে ওদের এই চেষ্টার কথা শুনে।’ বিদায়বেলায় খানিক অভিমান ঝরে পড়ল বলরামের গলায়। বললেন, ‘অনেক উচ্চশিক্ষিত আত্মীয় আছেন আমার৷ কেউ কেউ কলেজ শিক্ষক। আমরা অল্পশিক্ষিত বলে লজ্জায় কথা বলেন না। যোগাযোগ রাখতে চান না। তাই খুব জেদ উঠল বলতে পারেন। দেখি পাস করলে যদি মেশার যোগ্য হই!’

Be the first to comment on "বাবা-মা-ছেলের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা! "

Leave a Reply