ঢাকা ভেঙ্গে করা হবে ফরিদপুর বিভাগ : বললেন প্রধানমন্ত্রী 

দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে  আওয়ামী লীগ দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। দেশ ও জাতির লক্ষ্য পূরণের প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে জনসাধারণের সাহায্য চাইলেন প্রধানমন্ত্রী ।গতকাল ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে জেলা আওয়ামী লীগের ডাকা জনসভায় বক্তব্য রাখেন শেখ হাসিনা। এ সময় তিনি নতুন বিভাগ সম্পর্কে তার পরিকল্পনার কথা জানান।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুবল চন্দ্র সাহা। বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, কাজী জাফর উল্যাহ, মুহম্মদ ফারুক খান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খান, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, শ্রমবিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান সিরাজ, কার্যনির্বাহী সদস্য এস এম কামাল হোসেন, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান খন্দকার মোহতেসাম হোসেন বাবর, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কাওছার, যুব মহিলা মহিলা লীগের সভাপতি নাজমা আক্তার, ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ প্রমুখ। জনসভা পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান ও ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মাসুদ হোসেন।

জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই অঞ্চলের মানুষেরা যখনই নৌকায় ভোট দিয়েছে তখনই উন্নতি হয়েছে। আপনাদের ওয়াদা চাই, ২০১৯ সালে নির্বাচন হবে, সেই নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট দেবেন, যাতে আমরা উন্নয়ন কাজ শেষ করতে পারি। ’ প্রধানমন্ত্রী জনসভায় উপস্থিত সবার দ্দেশে জানতে চান, ‘আপনারা কি নৌকা মার্কায় ভোট দেবেন? দুই হাত তুলে বলেন। ’ তখন সমবেত জনতা দুই হাত ওপরে তুলে নৌকায় ভোট দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন।

প্রধানমন্ত্রী বিএনপি-জামায়াতের সমালোচনা করে বলেন, ‘আমরা যখন জনগণের উন্নয়নের জন্য কাজ করি তখন ওই বিএনপি-জামায়াত জ্বালাও-পোড়াও আর জঙ্গিবাদ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আমরা জনগণের সেবা করি, জনগণের জন্য কাজ করি। বাংলাদেশের পাঁচ কোটি মানুষ আজ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। আমরা বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উেক্ষপণ করছি। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছি। ’

২০০১ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর চালানো অত্যাচারের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘নিশ্চয় ফরিদপুরবাসী ভুলে যায়নি ২০০১ সালে ওই বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এসে কিভাবে এই অঞ্চলের মানুষের ওপর অত্যাচার নির্যাতন চালায়। সেই সময় তারা সারা বাংলাদেশে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তাদের অত্যাচারের চিহ্ন প্রতিটি ঘরে ঘরে রয়েছে। ’ এই সময়ে তিনি ফরিদপুর অঞ্চলের নির্যাতিত নেতাকর্মীদের নাম উল্লেখ করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘তারা এখানেই থেমে থাকেনি। ২০১৪-১৫ সালে আন্দোলনের নামে মানুষের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে। মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে। অবরোধ দিয়ে ৯২ দিন জ্বালাও-পোড়াও চালিয়ে মানুষ হত্যা করেছে। সেই অবরোধ তুলে নেওয়ার ঘোষণা তিনি (খালেদা জিয়া) এখনো দেননি। ’

সেই সময়ে বাস-ট্রাক-রেল-লঞ্চে দেওয়া আগুনের চিত্র তুলে ধরে তিনি আরো বলেন, ‘আমরা বাস কিনি, তারা আগুন দিয়ে পোড়ায়। তাদের রাজনীতি কি পেট্রলবোমা দিয়ে মানুষ পোড়ানো? এই কাজের হুকুম দেয় কে? আপনারা জানেন, এয়ারকন্ডিশন রুমে বসে ওই বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাত না করে ঘরে ফিরে যাবেন না। কিন্তু দেখা গেল, তাদের এই অত্যাচার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে যখন দেশের মানুষ প্রতিরোধ গড়ে তুলল, তখন বাধ্য হয়ে নাকে খত দিয়ে তাঁকে ঘরে ফিরে যেতে। ’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এদের কাজই হলো অত্যাচার-নির্যাতন করা, ক্ষমতায় থেকে লুটপাট, দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং, টাকা-পয়সা চুরি করা। এ দেশের জনগণের কল্যাণে তারা কোনো কাজ করে নাই। আওয়ামী লীগ জনগণের সংগঠন। আপনারা ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভোট দিয়ে নৌকাকে বিজয়ী করেছিলেন। আপনাদের ধন্যবাদ জানাই। আমরা ফরিদপুরের উন্নয়ন করতে পেরেছি। ’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গরিবের বন্ধু হচ্ছে আওয়ামী লীগ। আমরা ভূমিহীনদের মাঝে খাসজমি বিতরণ করে দিচ্ছি, পাশাপাশি আশ্রয়ণ প্রকল্প করে, যেটা জাতির পিতা শুরু করেছিলেন—সেই গুচ্ছগ্রামে আমরা প্রত্যেক গৃহহীন মানুষকে ঘরবাড়ি বানিয়ে দিচ্ছি। ইনশাল্লাহ একজন মানুষও গৃহহীন থাকবে না। যাদের ঘর নাই, বাড়ি নাই, গৃহ নাই তাদের প্রত্যেকের জন্য সরকার বিনে পয়সায় ঘর তৈরি করে দেবে। ’ এ সময় শিক্ষা, কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের গৃহীত নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

জঙ্গিবাদবিরোধী সচেতনতা সৃষ্টির তাগিদ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যারা ছাত্রছাত্রী তাদের কাজ লেখাপড়া করা। জঙ্গি, মাদক, সন্ত্রাসের পথ পরিহার করতে হবে। অভিভাবকবৃন্দ, শিক্ষক, ইমাম, আলেম-মাশায়েখ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সকলের কাছে আমার আহ্বান থাকবে, একটা ছেলেমেয়েও যেন ওই সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও মাদকের পথে না যায়। স্কুলে যে ছেলে-মেয়েরা অনুপস্থিত তাদের হিসাব দিতে হবে। মা-বাবাকে তাঁদের ছেলেমেয়েরা কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করে, কার সঙ্গে মেশে সে খবর রাখতে হবে। ’

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ইসলামের পথ নয়। ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলাম নিরীহ মানুষকে হত্যা করতে কখনো বলেনি। ইসলাম ভ্রাতৃত্বের ধর্ম, সৌহার্দ্যের ধর্ম। আমাদের নবী শিক্ষা দিয়েছেন, যে যে ধর্মেরই হোক তাদের সহযোগিতা করতে। সেখানে নিরীহ মানুষকে হত্যা করা আর আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া ইসলাম সমর্থন করে না। কাজেই আমি মসজিদের ইমাম সাহেবদের অনুরোধ করব, যারা বিশ্বব্যাপী ইসলাম ধর্মের মানসম্মান নষ্ট করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। ’

বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চল নিয়ে একটি নতুন বিভাগ গঠনের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা ক্ষমতায় এসে নতুন নতুন বিভাগ করে দিয়েছি। রংপুর, ময়মনসিংহ বিভাগ করে দিয়েছি। ইনশাআল্লাহ ঢাকা বিভাগ ভেঙে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ নিয়ে আমরা নতুন বিভাগ করব। সেই পরিকল্পনা আমাদের আছে। জনগণ যাতে আরো বেশি সেবা পায়, সে ব্যবস্থা আমরা করে দিচ্ছি। ’

৯ বছর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফরিদপুর আগমন উপলক্ষে পুরো জেলার মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়। জনসভার নির্ধারিত সময় বিকেল ৩টার অনেক আগে থেকেই রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী সমবেত হয়। বিভিন্ন থানা, ইউনিয়ন ও আশপাশের জেলাগুলো থেকে নেতাকর্মীরা বর্ণাঢ্য মিছিল নিয়ে আসে ।

জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী ফরিদপুরে ২০টি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন এবং ১২টি নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। উন্নয়ন প্রকল্পগুলো হলো—ফরিদপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, পল্লীকবি জসীমউদ্দীন সংগ্রহশালা, ফরিদপুর ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি, শিশু একাডেমি, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শকের কার্যালয়, জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন, আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, ফরিদপুর ৫০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্লান্ট, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের একাডেমিক কাম পরীক্ষা হল, সদর উপজেলাধীন চর কমলাপুর খেয়াঘাট থেকে বিলমামুদপুর স্কুল সড়কে কুমার নদীর ওপর ৯৬ মিটার দীর্ঘ আরসিসি ব্রিজ, ভাঙ্গা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন, মধুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নয়ন, আঞ্চলিক নির্বাচন অফিস, বিএসটিআই ভবন, ভাঙ্গা থানা ভবন, মধুখালী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন, সদর উপজেলা থেকে বাখুণ্ডা জিসি হয়ে রসুলপুর ভায়া চরনিখুরদি সড়ক, ফরিদপুর সদর উপজেলাধীন ডিক্রিরচর ইউনিয়নের মুন্সিডাঙ্গি কমিউনিটি ক্লিনিক ও ৩৩/১১ কেভি হারুকান্দি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র।

প্রধানমন্ত্রী যে ১২ উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তার মধ্যে রয়েছে কুমার নদ পুনর্খনন, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ফরিদপুর পুলিশ সুপারের কার্যালয়, পুলিশ হাসপাতাল, পুলিশ অফিসার্স মেস, সালথা টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের একাডেমিক কাম প্রশাসনিক ভবন, চন্দ্রপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র, সরকারি সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজের ছাত্রীনিবাস, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, ১৫০০ আসনবিশিষ্ট মাল্টিপারপাস হলরুম নির্মাণ, সালথা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন, সদরপুর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন প্রকল্প।

Be the first to comment on "ঢাকা ভেঙ্গে করা হবে ফরিদপুর বিভাগ : বললেন প্রধানমন্ত্রী "

Leave a Reply