ছোট সন্তানকে সহ্য করছে না বড়টি? জেনে নিন কিছু পরামর্শ

একটি সন্তান থাকলে তাকে ঘিরে বাবা-মায়ের সব আনন্দ-উচ্ছ্বাস আর ভালোবাসার প্রকাশ হয়। এরপর দ্বিতীয় সন্তান হলে তার প্রতিও সমান নজর দিতে হয় বাবা-মায়ের। আর এ অবস্থা প্রথম সন্তানের মানসিক চাপের কারণ হতে পারে। ধীরে ধীরে বদলে যেতে পারে প্রথম সন্তানের আচরণ। দুটি সন্তান একসঙ্গে বেড়ে ওঠে কিন্তু বেড়ে ওঠার বিভিন্ন ধাপে তাদের সক্ষমতা যেমন প্রকাশ পায়, একই সঙ্গে একজন আরেকজনের থেকে পিছিয়ে থাকা বিষয়গুলোও প্রকাশ হয়। এ নিয়ে পরিবারে চলে নানা আলোচনা-সমালোচনা। যার ফলাফল একটি কোনো একজনের ওপর নেতিবাচক প্রভাবও ফেলতে পারে। দুই সন্তানের মা গৃহিণী তন্বী জানাল, তার দুটি সন্তান। প্রথম সন্তানটি মেয়ে আর দ্বিতীয় সন্তানটি ছেলে। মেয়ের জন্মের ঠিক পাঁচ বছর পর ছেলের জন্ম হয়। সে খেয়াল করেছে, ছেলের জন্মের পর মেয়েটি আগের তুলনায় কম কথা বলতে শুরু করে। যদিও ছেলে এবং মেয়ে দুজনকেই সমান ভালোবাসে তন্বী ও তার বর। তন্বী বলে, ‘আমি আমার ছেলেকে কোলে নিয়ে আদর করার সময় ওর মধ্যে একধরনের অসহায়ত্বও খেয়াল করেছি। এরপর থেকে সে হঠাৎ রেগে যাওয়া শুরু করে। ঘুমানোর সময় আমাকে ধরে রাখতে চায়। সে আরও চায়, আমি কেবল তার দিকেই ঘুরে শুয়ে থাকি। তারপর নিজ হাতে খাবে না বলে বায়না শুরু করে।’
বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওদের চাহিদা ভিন্ন হতে থাকে। ওরা বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন পরিবর্তন এসেছে। এখন মেয়েটি ক্লাস সেভেনে পড়ে আর ছেলেটি টুতে। পড়ালেখায় ছেলেটি এগিয়ে। অল্প সময় পড়লে মুখস্থ করে ফেলতে পারে। মেয়েটি তা নয়। সময় নিয়ে পড়তে হয়।

তা ছাড়া মেয়েটি বাইরের লোকজনের সঙ্গে মিশতে খুব বেশি পছন্দ করে না, ছেলে তার উল্টো। নিজের কী পছন্দ কী পছন্দ না ছেলেটি সরাসরি বলে, মেয়ে বলবে না কিন্তু ভেতরে ভেতরে রেগে থাকবে। ছেলেকে কোনো কিছু দিলে সেটা নিয়ে কথা বলবে।

সাধারণ দুই সন্তান একই পরিবারের হলেও আচরণে থাকে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। সব রীতিনীতির সঙ্গে যে তাল মিলিয়ে নিতে পারে, সে সবার আদর-ভালোবাসা বেশি বেশি পায়। আর যে একটু পিছিয়ে পড়ে তুলনামূলক নেতিবাচক আলোচনা তাকে আরও পিছিয়ে দেয়। অথবা হতাশ করে তোলে।

এ অবস্থায় অভিভাবকের করণীয়-

‘প্রতিটি শিশু যেমন বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে আলাদা, তেমনি সব বিষয়ে সবার পারদর্শিতাও এক নয়। কিন্তু তারপরও প্রায় সব শিশুই জন্ম নেয় অমিত সম্ভাবনা নিয়ে। বাবা-মায়ের ধৈর্যশীল আচরণ, গ্রহণযোগ্যতা আর শিক্ষকতাই পারবে সেই সম্ভাবনার যথাসম্ভব পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে। বলছিলেন মেখলা সরকার, মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ, সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল।

দুই সন্তানের পড়ালেখা নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা:

দুই সন্তানের পড়ালেখার প্রতি সমান আগ্রহ থাকবে না নয়। একজন হয়তো সময়ের কাজ সময়ে করে নেয়, আরেকজন একটু ধীরগতির। এ অবস্থায় সব সময় হোমওয়ার্ক বা পড়ালেখা নিয়ে রেগে থাকবে না। স্কুল, কোচিং বা খেলা থেকে আসার পরপরই হোমওয়ার্ক বা পড়ালেখা নিয়ে কথা বলবে না। বরং তাদের প্রয়োজনীয় বিশ্রামের সময় দিয়ে ধীরেসুস্থে বিষয়টি সামনে নিয়ে আসতে হবে। বকাঝকা বা শাসন করে হোমওয়ার্ক করাবে না। এতে সন্তানের মনে পড়ালেখা নিয়ে অহেতুক ভীতি তৈরি হয়। ভীতিই সন্তানের মনে পড়ালেখায় আনন্দ, আগ্রহ ও মনোযোগ কমিয়ে দেয়। বরং শাসনের পরিবর্তে প্রয়োজনে সাময়িকভাবে আদর, কথা বলা কমিয়ে দাও অথবা আচরণে সাময়িক দূরত্বের একটা ভাব আনবে। পড়ালেখার বিষয়ে অন্য বাচ্চার সঙ্গে নেতিবাচক তুলনা করবে না।

সন্তানের আগ্রহ বাড়িয়ে দিতে হবে:

বাবা-মায়ের উচিত ধৈর্য রাখা। পড়ালেখা-খেলাধুলা-আলাপ আলোচনায় আগ্রহ তৈরিতে যথেষ্ট সুযোগ ও সময় সন্তানকে দিতে হবে। পড়াশোনা শুরুর প্রথমেই খুব ভালো ফল করতে হবে এমন প্রত্যাশা থেকে সরে এসে বরং সন্তানের কাছে বইয়ের প্রতি যেন একটা আগ্রহ তৈরি হয়, সেটার দিকে মনোযোগী হতে হবে। পড়ালেখার বা হোমওয়ার্ক প্রথমেই একেবারে ঘড়ি ধরে রুটিনমাফিক না করে শিশুর ইচ্ছা অনুযায়ী দিনের যেকোনো সময় বসাতে হবে। একই সঙ্গে একটানা দীর্ঘক্ষণ শিশুকে জোর করে পড়ার মধ্যে ধরে রাখবে না। কারণ, এ বয়সের সন্তান অনেকক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। পড়ার সময় মাঝেমধ্যে তাকে উঠতে দেওয়ার সুযোগ দেবে। পড়ালেখার বিষয়টি যথাসম্ভব খেলাচ্ছলে করার চেষ্টা করবে, গল্পের মধ্যে করবে।

কৈশোরের আগ পর্যন্ত সাধারণত মা-বাবাই শিশুর জগতের প্রধান ও মধ্যমণি হিসেবে কাজ করে। তাদের আচরণ বা ব্যবহারের প্রতি মনোযোগ দেবে।

অনেক সময়ই দেখা যায়, প্রাথমিক পর্যায়ে মোটামুটি ভালো ফল করা ছেলে বা মেয়েটি মাধ্যমিকে গিয়ে খুব একটা ভালো করতে পারছে না। মায়েদের মূলত এ সময়টা জোর দেওয়া উচিত বইয়ের প্রতি সন্তানের আগ্রহ তৈরিতে। এই আগ্রহ তৈরি হতেই তাদের কিন্তু লেগে যাবে বেশ কিছু সময়। কাজেই এই সময়টা না দিয়ে যদি অহেতুক চাপ তৈরি করা হয়, তাহলে পড়ালেখা বা বইয়ের প্রতি কিন্তু শুধু দূরত্বই তৈরি হবে। ফলে স্কুলের একটা পর্যায় পর্যন্ত হয়তো মুখস্থ করে পার পাওয়া যাবে, কিন্তু যখন বিশ্লেষণ করে কোনো পড়াশোনা আত্মস্থ করার বিষয় আসবে তখন সেটা আর সে পারবে না।

দুটি সন্তান থাকলে তারা একজন আরেকজনের সঙ্গে নিজের পড়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারে। সেদিকে খেয়াল রাখবে। যখনই দেখবে নিজেরা নিজেরা পড়ালেখা নিয়ে আলোচনা করছে তখনই প্রশংসা করবে।

Be the first to comment on "ছোট সন্তানকে সহ্য করছে না বড়টি? জেনে নিন কিছু পরামর্শ"

Leave a Reply