ঘরের সাজাতে মাটির আসবাবপত্র

সেই প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের সংস্কৃতিতে মাটির তৈরি নানান তৈজসপত্র ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তখন মাটির তৈরি এসব তৈজসপত্রের ব্যবহার সময়ের প্রয়োজনে হলেও কালের বিবর্তনে তার জায়গা করে নেয় চিনামাটি, তামা, পিতল, কাঁসা এবং স্টিলের নানান আসবাবপত্র। তবে পুরোনো ফ্যাশন যেমন একসময় আবার নতুন করে ফিরে আসে, তেমনি বর্তমানে মৃৎশিল্পও শুধু তার ব্যবহার উপযোগিতাকে ছাপিয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে ঘরদোর সাজানোর কাজেও। স্বল্প খরচ, নান্দনিক এবং বাহারি ডিজাইনের ফলে বর্তমানে অন্দরমহল সাজাতে মৃত্তিকার তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্রের জুড়ি মেলা কঠিন। তাহলে চলো একনজরে দেখে আসা যাক মাটির তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্র দিয়ে কীভাবে নান্দনিক করে সাজিয়ে নিতে পারো তোমার অন্দরমহলটিকে।

শোপিস হিসেবে
মাটির তৈরি ছোট ছোট তৈজসপত্র বিশেষ করে মোমদানি, কলমদানি, মাছ, ফুল, ফল শোপিস হিসেবে খুব সহজেই পড়ার টেবিল, শোকেস ইত্যাদিতে মানিয়ে যায়। এ ছাড়াও বড় শোপিস হিসেবে মাটির তৈরি বিভিন্ন জীবজন্তু যেমন হাতি, বাঘ ইত্যাদিও শোপিস হিসেবে বহুল ব্যবহৃত হয়ে আসছে বহুকাল ধরেই। ঘরের প্রবেশপথেই এগুলোকে রাখতে পারো। এ ছাড়াও ছোট ছোট তৈজসপত্রগুলোকে পড়ার টেবিল, টি টেবিল, শোকেসে সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য রাখতে পারো।

দেয়ালের সজ্জা
শুধু আসবাবপত্রই নয়, তোমার ঘরের দেয়ালটিকেও মাটির তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্রের মাধ্যমে দিতে পারো নতুন এক লুক। এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারো বিভিন্ন পোড়ামাটির ফলক, টেরাকোটা ইত্যাদি। দেয়ালে রং কিংবা টাইলসের বদলে টেরাকোটা কিংবা পোড়ামাটির ফলক ব্যবহারে তোমার দেয়ালের শোভা যেমন বেড়ে যাবে কয়েক গুণ তেমনি দামি প্লাস্টিক পেইন্ট কিংবা সিরামিক টাইলসের তুলনায় খরচও কমবে ঢের। বর্তমানে নানান ধরনের পশুপাখি, গ্রামীণ জীবনযাপন, আচারপ্রণালি ইত্যাদি ছাড়াও বিমূর্ত (অ্যাবস্ট্রাক্ট) টেরাকোটাও পাওয়া যায়। এ ছাড়া টেরাকোটাগুলোও এখন আর আগের মতো শুধু লালচে রঙের নয়, নানান আকারের ও রঙের টেরাকোটা এখন বাজারে পাওয়া যায়। দেয়ালের ধরন, আসবাবপত্র, পারিপার্শ্বিক অবস্থান ইত্যাদির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখন যে কোনো রঙের টেরাকোটা কিংবা পোড়ামাটির ফলক দিয়ে সাজাতে পারো তোমার বসার কিংবা শোবার ঘরের দেয়ালটিকে।

খাবার টেবিলে
বাজারে নানান আকারের ও ডিজাইনের মাটির থালা, মগ, গ্লাস, গামলা, লবণদানি ইত্যাদি পাওয়া যায়। মাটির তৈরি বলে এগুলো দামে খুবই সস্তা। তবে দেখতে বেশ আকর্ষণীয়। অতিথি আপ্যায়নে এগুলো ব্যবহার করতে পারো। এগুলো ঘরে আসা অতিথির কাছে তোমার রুচিবোধ এবং সংস্কৃতিমনা মনের একটি সুন্দর পরিচয় তুলে ধরতে খুবই সহায়ক। খাবার পরিবেশন ছাড়াও খাবার টেবিলে শোপিস হিসেবেও মাটির বাসনকোসন রাখতে পারো। মাটির ফুলদানিতে রাখতে পারো কয়েকটি তাজা ফুল। এতে করে খাবার টেবিলে সহজেই গ্রামীণ পরিবেশের একটি ছাপ চলে আসবে। পহেলা বৈশাখ, ঈদ কিংবা পূজা-পার্বণে মাটির হাঁড়িতে করে ভাত বা পোলাও পরিবেশন করতে পারো। মাটির হাঁড়ি সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি তাপ প্রতিরোধী, ফলে এতে খাবার দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ভালো থাকে।

বসার ঘরে
যে কোনো প্রয়োজনে বাইরে থেকে কেউ এলে তাকে আমরা বসার ঘরে বসাই, অর্থাৎ বাইরে থেকে যে কেউই আসুক না কেন আমাদের বসার ঘরের সঙ্গেই তার প্রথম পরিচয় পর্ব ঘটে। বসার ঘরে অনেকেই নানান ধরনের জিনিস দিয়ে ঠেসে রাখে, যার কারণে ঘরে একটা ঘিঞ্জি ভাব চলে আসে। বসার ঘরে বেতের তৈরি সোফা রাখতে পারো। সঙ্গে মাটির আসবাব হিসেবে দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইত্যাদি বিখ্যাত মনীষীদের মুখায়ব অথবা মুখোশ ঝুলিয়ে দাও। একপাশে মাটির তৈরি একটা আয়নাও রাখতে পারো। ঘরের বিভিন্ন কোণে মাটির তৈরি সরা, সানকি, পটারি রাখতে পারো। সবচেয়ে ভালো হয় এগুলোতে রং করতে পারলে। এই কাজটি তুমি নিজেও করতে পারো অথবা কেনার সময় দোকান থেকেও নিজের চাহিদামতো রঙে রাঙিয়ে নিতে পারো। তবে নিজে হাতে করলে তোমার সৃজনশীলতা সবার সামনে তুলে ধরার সুযোগটি তুমি পাবে। বাড়তি চমক আনতে সেগুলোতে লাইটিংয়ের ব্যবস্থা করতে পারো, এবার দেখো তো কেমন হয়েছে তোমার বসার ঘরটি? নিশ্চয়ই আগের তুলনায় একেবারেই অন্য রকম।

বারান্দায়
গায়ে গা লাগিয়ে বেড়ে ওঠা এই শহরে এক টুকরো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার জায়গা করে দেয় আমাদের বারান্দাগুলো। চাইলে বারান্দাতে তুমি মাটির তৈরি আসবাবগুলো সহজেই ব্যবহার করতে পারো। ছোট-বড় নানান আকৃতির মাটির টবে গাছ লাগাতে পারো। এতে করে বারান্দায় সবুজাভ একটা ভাব চলে আসবে। চাইলে মাটির ছোট্ট টবগুলোকে নানান আকৃতিতে শিকার সাহায্যে ঝুলিয়ে দিতে পারো। বারান্দায় বসার জায়গা থাকলে সেখানে মাটির বড় সানকি বসাতে পারো। সানকিটি রঙিন হলে ভালো হয়। এরপর এটিতে পানি ভরে সেখানে রঙিন মাছ ছাড়তে পারো। পানির ওপরে প্লাস্টিকের তৈরি পানা ব্যবহার করতে পারো। এতে করে সানকিটি দেখতে পুকুরের মতো মনে হবে। সন্ধ্যায় সেখানে ভাসমান মোমবাতি জ্বেলে দিলে আলো-আঁধারির আবহে মোহনীয় এক পরিবেশের সৃষ্টি হবে।

Be the first to comment on "ঘরের সাজাতে মাটির আসবাবপত্র"

Leave a Reply